নেমে যাচ্ছে পানির স্তর: সেচ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে বরেন্দ্র অঞ্চল

গোদাগাড়ী-তানোরে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশেষ প্রতিনিধি | রাজশাহী

রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষি ও জনজীবনে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলার গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলায় সেচের পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ভুগছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে প্রতিবছর পানির স্তর নিচে নামার হার এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে।

কৃষিতে বিপর্যয় ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি মূলত গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় কৃষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও যে গভীরতায় পানি পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে অনেক গভীরে গিয়েও পর্যাপ্ত পানি মিলছে না। তানোরের ধানচাষি কুদ্দুস আলী জানান, পানির অভাবে এখন ধান চাষ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেচ পাম্প চালাতে জ্বালানি খরচ ও নতুন নলকূপ বসানোর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ধান চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

শুধু কৃষি নয়, দৈনন্দিন ব্যবহারের পানির জন্যও হাহাকার চলছে গ্রামগুলোতে। অনেক এলাকায় সাধারণ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। হাটবকল এলাকার বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, “আগে বাড়ির পাশের টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যেত, এখন কয়েক গ্রাম ঘুরে গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।” এই সংকটের কারণে নারী ও শিশুদের কষ্ট সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

স্থানীয় সাংবাদিক আশরাফুল ইসলাম জানান, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির গঠন শক্ত হওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ সীমিত। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে এই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী:

  • বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টির মাধ্যমে ভূগর্ভে জমা হয় বছরে প্রায় ৯০০ মিলিমিটার পানি।
  • বিপরীতে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১৩০০ মিলিমিটার পানি। এই বিশাল ঘাটতিই সংকটকে দিন দিন ঘনীভূত করছে।

প্রশাসনের উদ্যোগ ও বিকল্প চাষের পরামর্শ

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছাঃ উম্মে ছালমা জানান, পানির ওপর চাপ কমাতে কৃষকদের ধান চাষ কমিয়ে কম পানি লাগে এমন রবিশস্য (গম, ভুট্টা, ডাল, তিল) চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জিন্নুরাইন খান জানান, ভূগর্ভস্থ পানির নির্ভরতা কমাতে নদী-খাল খনন, জলাধার পুনর্খনন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। একই সাথে পানির অপচয় রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজও চলছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *