নিজস্ব প্রতিবেদক
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল ওদুদ ও তাঁর স্ত্রী মর্জিনা ওদুদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, শত শত কোটি টাকার সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেন এবং মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দায়ের হওয়া দুদকের পৃথক দুটি মামলা এখন জনমনে নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ১৮০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক লেনদেন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ সামনে এলেও, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকার পর কেন কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি তা নিয়েই উঠছে বিতর্ক।
বুধবার (৯ এপ্রিল) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মহাপরিচালক আক্তার হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
দুদক সূত্র জানায়, সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১ কোটি ৩৫ লাখ ৮১ হাজার টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর নামে পরিচালিত ৩৩টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১৭২ কোটি ৩৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য উঠে এসেছে তদন্তে।
অন্যদিকে স্ত্রী মর্জিনা ওদুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, স্বামীর প্রভাব ও আর্থিক সহায়তায় তিনি ৪২ লাখ ১৬ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁর নামে থাকা ৭টি ব্যাংক হিসাবে ৭ কোটি ৫৪ লাখ ৮১ হাজার টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।
দুদক জানিয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
‘অভিযোগ ছিল বহুদিন, ব্যবস্থা এলো এত দেরিতে কেন
মামলার পর থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ভূমি দখল, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নানা সময়ে উঠলেও দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন যদি এত বিপুল অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেন ও অবৈধ সম্পদের তথ্য দুদকের হাতে থেকে থাকে তবে এতদিন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নীরব ছিল কেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয়ের কারণে কি তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া ধীরগতির ছিল এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবেক এমপি আব্দুল ওদুদ বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আতঙ্ক, নীরবতা ও প্রভাবের রাজনীতি
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বছরের পর বছর ধরে এলাকায় এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থবল ও বিভিন্ন চক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পেতেন না। অনেকে দাবি করেন, প্রশাসনের কিছু অংশও প্রভাবশালী মহলের চাপের বাইরে ছিল না।
স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ভাষ্য, শুধু মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ সম্পদের উৎস উদ্ঘাটন এবং অর্থপাচারের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সুশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়; তবে প্রতিটি ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। তাঁরা বলছেন, যদি তদন্ত প্রভাবমুক্ত না হয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়, তবে জনগণের আস্থা আরও সংকটের মুখে পড়বে।
তাঁদের মতে, এই মামলাগুলো কেবল দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন কতটা কার্যকর সেটিরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।