মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি: উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারই কি বাংলাদেশের আগামীর পথ?

বিশেষ কলাম

বাংলাদেশে মশার উপদ্রব এখন আর কেবল নাগরিক অস্বস্তি নয়, বরং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাবে এটি একটি গুরুতর জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। প্রথাগত ধোঁয়া বা ফগিং পদ্ধতি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে বলেই এখন বিজ্ঞাননির্ভর ও স্থায়ী সমাধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মশা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে।

মশা দমনে আধুনিক ও কার্যকর প্রযুক্তিসমূহ:

১. জেনেটিকালি-মডিফায়েড (GM) মশার ব্যবহার: ব্রাজিল ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে এই প্রযুক্তি সফল হয়েছে। গবেষণাগারে পরিবর্তিত পুরুষ মশা প্রকৃতিতে ছেড়ে দিলে তারা স্ত্রী মশার সাথে মিলিত হয়, কিন্তু তাদের ডিম ফুটে নতুন মশা জন্মায় না। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই মশার বংশবিস্তার হ্রাস পায়। বাংলাদেশে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি।

২. BTI ও ড্রোন প্রযুক্তির সমন্বয়: পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া BTI (Bacillus thuringiensis israelensis) মশার লার্ভা ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর এবং মানুষ বা অন্য প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। ড্রোন ব্যবহার করে দুর্গম জলাশয়, বড় ড্রেন বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নির্ভুলভাবে এই লার্ভিসাইড ছিটানো সম্ভব, যা শ্রম ও সময় উভয়ই সাশ্রয় করবে।

৩. স্মার্ট নজরদারি ও AI-ভিত্তিক পূর্বাভাস: সেন্সর ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মশা নজরদারি সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেই কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় মশার প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব।

৪. ওভিট্র্যাপ (AGO) ও জৈবিক নিয়ন্ত্রণ: আবাসিক এলাকায় বিশেষ ফাঁদ বা AGO Ovitrap স্থাপন করে স্ত্রী এডিস মশা নিধন করা যায়। পাশাপাশি জলাশয়ে গাপ্পি বা টিলাপিয়ার মতো লার্ভা-খাদক মাছ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

৫. স্মার্ট ড্রেনেজ ও নালা পুনরুদ্ধার: মশা দমনের মূল চাবিকাঠি হলো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি। সেন্সরযুক্ত স্মার্ট ড্রেনেজ সিস্টেম ব্যবহার করলে কোথাও পানি জমে থাকলে তা তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা যায়। নালা-খাল দখলমুক্ত করে পানির প্রবাহ সচল রাখা এডিস ও কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ৬০ শতাংশ ভূমিকা রাখে।

সমন্বিত করণীয়:

দেশের মশক নিধন কর্মসূচিকে সফল করতে একটি জাতীয় “মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি টাস্কফোর্স” গঠন করা প্রয়োজন। সারা বছরব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বৃদ্ধি এবং স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল এই জাতীয় সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

উপসংহার: পুরনো মান্ধাতা আমলের পদ্ধতি দিয়ে বর্তমানের শক্তিশালী মশা দমন করা আর সম্ভব নয়। দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং উন্নত বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশকে একটি মশামুক্ত ও স্বাস্থ্যকর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে।


লেখক: রাজনৈতিক ও উন্নয়ন কৌশলবিদ; প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, ভূঁইয়া গ্লোবাল ফাউন্ডেশন।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *