মুজাহিদ খাঁন কাওছার, বিশেষ প্রতিনিধি: দিনের আলোয় জনাকীর্ণ সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি রাতের আঁধারে হয়ে উঠত এক বিভীষিকার জনপদ। সেখানেই চলত এক বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের খুনের উৎসব। যার শিকার ছিল সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও ভবঘুরে মানুষ। পুলিশের খাতায় সেই ঘাতকের নাম এখন ‘সাইকো সম্রাট’।
যেভাবে প্রকাশ্যে এলো সিরিয়াল কিলিং: সাভারে একের পর এক লাশ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তদন্তে নামে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে মশিউর রহমান খান সম্রাট নামে এক ব্যক্তির রহস্যজনক উপস্থিতি। গভীর রাতে কমিউনিটি সেন্টারে প্রবেশ এবং ভোরের আগে বেরিয়ে যাওয়া ছিল তার নিয়মিত রুটিন। তদন্তে বেরিয়ে আসে, সম্রাট ইচ্ছাকৃতভাবে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ভবঘুরে ও প্রতিবন্ধীদের টার্গেট করত, যাতে তাদের নিখোঁজ বা মৃত্যু নিয়ে কেউ প্রশ্ন না তোলে।
ভাই সম্বোধন করেও বাঁচেনি সোনিয়া: সম্রাটের নৃশংসতার সবচেয়ে করুণ শিকার অটিস্টিক প্রতিবন্ধী নারী তানিয়া ওরফে সোনিয়া। গত শুক্রবার রাতে স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহায়তায় পুলিশ যখন কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর তাকে উদ্ধার করে, তখন পাশে শুয়ে থাকা সম্রাটকে সোনিয়া ‘ভাই’ বলে পরিচয় দেয়। সম্রাটের স্বাভাবিক আচরণের কারণে পুলিশ তখন সন্দেহ করেনি। কিন্তু এর একদিন পর রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সেই সোনিয়ারই নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। যে মানুষটিকে ‘ভাই’ ডেকে নিরাপত্তা চেয়েছিল, সেই সম্রাটের হাতেই প্রাণ দিতে হয় তাকে।
তদন্ত ও গ্রেপ্তার: রবিবার দুপুরে দুটি লাশ উদ্ধারের পর সাভার মডেল থানা পুলিশ, ডিবি, সিআইডি ও র্যাবসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা অভিযানে নামে। মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে সিসিটিভি ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক আলামত বিশ্লেষণ করে সম্রাটকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। পুলিশ আশঙ্কা করছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
পুলিশের বক্তব্য: সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আরমান আলী জানান, “এটি একটি পরিকল্পিত সিরিয়াল হত্যাকাণ্ড। সম্রাট সমাজের অবহেলিত মানুষের অসহায়ত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং সোমবার তাকে আদালতে তোলা হবে। এই চক্রে আরও কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
সাভারের সেই কমিউনিটি সেন্টার এখন একেকটি নিস্তব্ধ আর্তনাদের সাক্ষী। ‘সাইকো সম্রাট’ গ্রেপ্তার হলেও এই ঘটনা সমাজের প্রান্তিক মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকে আরও একবার বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।