নিজস্ব প্রতিবেদক
সাভার, ৪ জুলাই ২০২৫:
স্ত্রীর দেওয়া কিডনিতে জীবন ফিরে পেয়ে সেই স্ত্রীকেই নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন স্বামী মোহাম্মদ তারেক। অভিযোগে জানা গেছে, সুস্থ হওয়ার পর থেকে তারেক অনলাইন জুয়া ও পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি তার পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে বসবাস করছেন।
অমানবিক এ ঘটনার শিকার স্ত্রী উম্মে সাহেদীনা টুনি স্বামীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও যৌতুক আইনে আদালতে মামলা করেছেন। মামলার পর তারেক কিছুদিন গ্রেফতার থাকলেও বর্তমানে জামিনে মুক্ত এবং পলাতক রয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে ঢাকার সাভার উপজেলার সদর ইউনিয়নের ১নং কলমা এলাকায়।
প্রেম, ত্যাগ আর প্রতারণার গল্প
২০০৬ সালে পারিবারিকভাবে তারেক ও টুনির বিয়ে হয়। এক বছর পর তাদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। ২০০৮ সালে তারেকের দুটি কিডনিই অচল হয়ে পড়লে শুরু হয় চিকিৎসা পর্ব। স্ত্রী টুনি তাকে ভারতে নিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজেই একটি কিডনি দান করেন।
২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতের দিল্লির অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসক কৈলাস নাথ সিংয়ের তত্ত্বাবধানে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। এসময় টুনি শুধু কিডনিই নয়, নিজের উপার্জন, স্বর্ণালংকার ও পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে স্বামীর চিকিৎসার খরচও চালান।
অত্যাচার ও নির্যাতনের শুরু
অপারেশনের পর থেকেই তারেকের আচরণ পরিবর্তন হতে থাকে। স্ত্রী টুনির অভিযোগ অনুযায়ী, তারেক এক ডিভোর্সি নারী তাহমিনার সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে টুনিকে মারধর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
অভিযোগে বলা হয়, টুনিকে তার উপার্জনের সব টাকা দিতে বাধ্য করা হতো এবং শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকা এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো। বাধ্য হয়ে টুনি ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় অভিযোগ করেন। কিন্তু তারেক মুচলেকা দিয়ে অভিযোগ তুলে নেন। পরে নির্যাতন বেড়ে গেলে ২২ এপ্রিল আদালতে নারী নির্যাতন ও যৌতুক আইনে মামলা দায়ের করেন টুনি।
পরিবারের আহাজারি ও আইনি লড়াই
টুনির মা বলেন, “আমার পেনশনের সব টাকা তারেকের চিকিৎসায় খরচ করেছি। আজ সেই ছেলে আমার মেয়েকে ঘরছাড়া করেছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”
টুনির আইনজীবী নেহার ফারুক বলেন, “এই ঘটনা শুধু নারী নির্যাতন নয়, এটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন লঙ্ঘনের আওতাতেও পড়ে। প্রতারণার মাধ্যমে স্ত্রীর কিডনি নিয়ে এখন তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আমরা চার্জশিট হাতে পেলেই তার জামিন বাতিলের আবেদন করব।”
তারেকের অবস্থান
জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকে তারেক পলাতক। তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি এবং তার পরিবারের কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
এই ঘটনা সামাজিকভাবে আলোড়ন তুলেছে এবং নারী ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালত এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার।