রাইস ব্র্যান অয়েল ক্রয়ে দামের বড় ব্যবধান, টিসিবির কেনাকাটায় উঠছে প্রশ্ন

বাজারদর ১৫০, টিসিবির ক্রয়দর ১৮১.৫০ টাকা—এক কোটি লিটারে সম্ভাব্য ব্যবধান ৩১.৫০ কোটি টাকা; বেনাপোল দিয়ে ভারতে পণ্য যাওয়ার অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি

রাইস ব্র্যান অয়েলকে ঘিরে সরকারি ক্রয়, বাজারদর, সীমান্ত বাণিজ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একটি আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, খোলা বাজারে প্রতি লিটার রাইস ব্র্যান অয়েলের দাম প্রায় ১৫০ টাকা হলেও ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) জন্য একই ধরনের তেল প্রায় ১৮১ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার প্রক্রিয়া হয়েছে। এতে প্রতি লিটারে সম্ভাব্য মূল্য ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ৩১ টাকা ৫০ পয়সা।

প্রায় এক কোটি লিটার তেলের হিসাবে এই ব্যবধানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে পণ্যের মান, প্যাকেজিং, পরিবহন, কর-ভ্যাট, সরবরাহ ব্যয়সহ বৈধ অন্যান্য খরচ বিবেচনায় না নিয়ে এই পুরো অর্থকে সরকারি ক্ষতি হিসেবে চূড়ান্তভাবে দেখার সুযোগ নেই। ফলে প্রকৃত ক্রয়মূল্য ও বাজারদরের তুলনামূলক বিশ্লেষণই পারে অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট করতে।

প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ক্রয়ে বাজারদরের সঙ্গে এই পার্থক্যের কারণ কী? দরপত্রে কতটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল? সর্বনিম্ন দর কত ছিল? নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য দরদাতাদের দরের পার্থক্য কত? এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা ও সাশ্রয় নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না?

একই পণ্যের দামে এত পার্থক্য কেন?

টিসিবির জন্য প্রায় এক কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার ক্ষেত্রে প্রতি লিটার ১৮১ টাকা ৫০ পয়সা দরের প্রস্তাব ও অনুমোদনের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, একই সময়ে বাজারে রাইস ব্র্যান অয়েলের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে সরকারি ক্রয়মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা যাচাই করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে টিসিবির দরপত্রের পূর্ণাঙ্গ নথি, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ, কার্যাদেশ, সরবরাহ চুক্তি এবং অর্থ পরিশোধের তথ্য পর্যালোচনা করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হতে পারে।

কারণ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় শুধু অনুমোদিত দর নয়, কোন প্রক্রিয়ায় সেই দর নির্ধারিত হয়েছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বেনাপোল দিয়ে ভারতে পণ্য যাওয়ার অভিযোগ

রাইস ব্র্যান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে নেওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগটি সত্য কি না, তা যাচাই করতে বেনাপোল কাস্টমসের রপ্তানি নথি, বিল অব এক্সপোর্ট, ইনভয়েস, পরিবহন নথি, পণ্যের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ওয়েস্টার্ন এগ্রো প্রোডাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ দাবি করেন, ১৫০ টাকা দরের তেল তুলনামূলকভাবে ভালো মানের নয়। বাংলাদেশ থেকে ভারতে ডিওআরবি (De-oiled Rice Bran) যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতে কোনো ডিওআরবি যায়নি। তবে তাঁর দাবি এবং বেনাপোল দিয়ে সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানির অভিযোগ—দুই বিষয়ই কাস্টমস নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, বেনাপোল বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমাণ সংশ্লিষ্ট পণ্য বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছে। এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাইয়ে কাস্টমস ও বাণিজ্যিক নথি গুরুত্বপূর্ণ।

‘আটজনের সিন্ডিকেট’—অভিযোগের ভিত্তি কী?

আবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকজন ব্যবসায়ী পারস্পরিকভাবে সংশ্লিষ্ট থেকে রাইস ব্র্যান, ধান ও কৃষিভিত্তিক পণ্যের বাজারে প্রভাব বিস্তার করছেন। মোট আটজনকে ঘিরে একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অভিযোগও তোলা হয়েছে।

অভিযোগে ওয়েস্টার্ন এগ্রো প্রোডাকশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে তামিম গ্রুপের ফাউন্ডার চেয়ারম্যান শাহাজাহান আলীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। গ্রিন ওয়েল অ্যান্ড পোল্ট্রি ফিডের চেয়ারম্যান শাহিদুল রহমানের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। মজুমদার গ্রুপের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে কারও বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট পরিচালনা, কৃষককে ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করা কিংবা সরকারি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, দরপত্রে অংশগ্রহণ, সরবরাহ চুক্তি, আমদানি-রপ্তানি নথি ও আর্থিক লেনদেন স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

রাইস ব্র্যান থেকে ফিড, ফিড থেকে মাছের বাজার

রাইস ব্র্যান শুধু তেল উৎপাদনের কাঁচামাল নয়; এর সঙ্গে দেশের পোলট্রি ও মৎস্যখাতের খাদ্যশিল্পেরও সম্পর্ক রয়েছে।

অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, রাইস ব্র্যানের বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি তৈরি হলে ফিড উৎপাদনের খরচ বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে মাছ ও পোলট্রি উৎপাদন ব্যয়ে।

ফিডের দাম বাড়লে মাছচাষিদের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়বে। এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়তে পারে। তবে রাইস ব্র্যানের দাম বাড়াই ফিড বা মাছের দাম বৃদ্ধির একমাত্র কারণ কি না, তা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। ফিডের অন্যান্য কাঁচামালের দাম, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, ডলার বিনিময় হার ও বাজারচাহিদাও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষক কি ন্যায্য দাম পাচ্ছেন?

অভিযোগের আরেকটি দিক সরাসরি ধানচাষিদের সঙ্গে সম্পর্কিত।

দাবি করা হয়েছে, বড় ব্যবসায়ী বা মিলমালিকদের প্রভাবের কারণে কৃষকেরা অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পান না। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চললে ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে কৃষকের ন্যায্য দাম নির্ধারণে শুধু রাইস ব্র্যানের বাজার নয়, ধানের উৎপাদন খরচ, সরকারি সংগ্রহমূল্য, স্থানীয় বাজারদর, মিলিং খরচ, পরিবহন ব্যয় ও মৌসুমি সরবরাহ—সবকিছুর তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

১৭ বছরের অভিযোগ, প্রমাণ কোথায়?

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিগত প্রায় ১৭ বছর ধরে একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ধানচাষিদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করে আসছে।

এটি গুরুতর অভিযোগ। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী দীর্ঘ সময় ধরে বাজার নিয়ন্ত্রণ করেছে—এমন দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বছরের পর বছর ধানের বাজারদর, কৃষকের বিক্রিমূল্য, মিল পর্যায়ের ক্রয়মূল্য, ভোক্তা পর্যায়ের দাম এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাজার অংশীদারত্বের তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে ২০১০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ধান, রাইস ব্র্যান, ফিড ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে পূর্ণাঙ্গ বাজার তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

ভারতের মাধ্যমে পণ্য ঘুরে আসার অভিযোগ

অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাইস ব্র্যান ভারতে পাঠানোর পর সেখানে প্রক্রিয়াজাত বা মূল্য সংযোজন করে আবার বাংলাদেশে আনার একটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

যদি এমন কোনো বাণিজ্যিক চক্র থেকে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশে থাকা শিল্প সক্ষমতা ব্যবহার না করে পণ্য বাইরে নিয়ে গিয়ে আবার দেশে আনার প্রয়োজন কেন হচ্ছে এবং এতে কারা লাভবান হচ্ছেন?

এ ক্ষেত্রে কাস্টমস তথ্য, আমদানি-রপ্তানি নথি, পণ্যের এইচএস কোড, ইনভয়েস মূল্য, উৎপত্তি সনদ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কৃষি ও মৎস্যখাতে সম্ভাব্য প্রভাব

রাইস ব্র্যানের বাজার, ধানের দাম, ফিডের মূল্য এবং মাছ উৎপাদন—এসব খাত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

কাঁচামালের দাম বাড়লে ফিডের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। ফিডের দাম বাড়লে মাছচাষির উৎপাদন খরচ বাড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব মাছের বাজারদরেও পড়তে পারে।

অন্যদিকে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই অভিযোগে বর্ণিত বাজারচক্র সত্য হলে এর প্রভাব শুধু রাইস ব্র্যান অয়েল শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ধান, ফিড, মৎস্য ও ভোক্তা বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের সামনে যেসব তদন্ত জরুরি

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা জরুরি—

১. টিসিবির রাইস ব্র্যান অয়েল ক্রয়ের সম্পূর্ণ দরপত্র ও মূল্যায়ন নথি পর্যালোচনা।
২. একই সময়ে একই মানের পণ্যের খোলা বাজারদর যাচাই।
৩. সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক পরীক্ষা।
৪. বেনাপোল কাস্টমস দিয়ে রাইস ব্র্যান ও সংশ্লিষ্ট পণ্য রপ্তানির নথি যাচাই।
৫. সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি-রপ্তানি ও অর্থপ্রবাহ পর্যালোচনা।
৬. ধান, রাইস ব্র্যান, ফিড ও মাছের দামের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ।
৭. বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া বা প্রতিযোগিতাবিরোধী প্রভাব রয়েছে কি না, তা তদন্ত করা।

শুল্ক কমানোই কি সমাধান?

শিল্পসংশ্লিষ্টরা রাইস ব্র্যান অয়েল রপ্তানির ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক পুনর্বিবেচনা করে সম্ভব হলে শূন্য শতাংশে নামানোর দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের বক্তব্য, উচ্চ রপ্তানি শুল্কের কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। শুল্ক কমানো হলে উৎপাদন বাড়বে, শিল্পকারখানার সক্ষমতা কাজে লাগবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে রপ্তানি শুল্ক কমানোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে ধান ও রাইস ব্র্যানের দাম, কৃষকের স্বার্থ এবং ফিড ও মৎস্যখাতে সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এখন প্রয়োজন নথিভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত

রাইস ব্র্যান অয়েলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নথিভিত্তিক ও স্বাধীন তদন্ত।

টিসিবির ক্রয় নথি, কাস্টমসের আমদানি-রপ্তানি তথ্য, দরপত্র, বাজারদর, সরবরাহ চুক্তি, মালিকানা কাঠামো এবং আর্থিক লেনদেন একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তদন্তে যদি সরকারি ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য, যোগসাজশ, প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণ, বাজার কারসাজি কিংবা সীমান্ত বাণিজ্যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ বিষয়টি শুধু একটি তেলের বাজারের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধানচাষি, রাইস মিল, ফিডশিল্প, মাছচাষি, ভোক্তা এবং দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *