বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

ইতিহাস, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৪৮ বছরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর)। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ ৪৮ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় নানা আন্দোলন, সংগ্রাম, সংকট, উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দলের প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অঙ্গীকার এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সাংগঠনিক বিস্তার লাভ করে এবং বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বও পালন করে।

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপির যাত্রা

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন জিয়াউর রহমান। তিনি ছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি রূপরেখা তুলে ধরে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার এবং পরে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের বিষয়টিও বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপি কঠিন রাজনৈতিক সময়ের মুখোমুখি হয়।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন ও রাষ্ট্র পরিচালনা

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর সরকারের সময় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদি সরকার এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পরও তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষা, নারীশিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচিত হয়েছে।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপি প্রথমবারের মতো তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে—যা দলের নেতাকর্মীদের কাছে এবারের দিনটিকে বিশেষভাবে আবেগঘন করে তুলেছে।

নতুন নেতৃত্বে তারেক রহমান

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তারেক রহমান। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে তাঁর ভূমিকার কথা দলীয়ভাবে তুলে ধরা হয়।

বর্তমানে তারেক রহমান বিএনপির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে রেখে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি কেন্দ্রীয় ও সারাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

পরে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ নেতাকর্মীরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভার কর্মসূচি রয়েছে।

৪৮ বছরের পথচলা ও ভবিষ্যতের প্রত্যয়

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে যেমন রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে আন্দোলন, রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচনী পরাজয় ও বিজয় এবং দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক প্রতিকূলতা। দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ ও রাজনৈতিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

চার যুগের বেশি সময়ের এই পথচলায় নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়গুলোকে দলের মূল রাজনৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়ে থাকে।

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে স্মরণ ও আত্মপর্যালোচনারও সময়। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলটির প্রয়াত নেতাকর্মীদের স্মরণ করার পাশাপাশি আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মকৌশল ও সাংগঠনিক সক্ষমতা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন দলের নেতাকর্মীরা।

৪৮ বছরের এই পথচলায় বিএনপির সামনে যেমন রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তেমনি রয়েছে নতুন বাস্তবতায় জনগণের আস্থা ধরে রাখা, দলকে আরও সংগঠিত করা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের চ্যালেঞ্জ।

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *