জমি বিক্রিতে মূল্য গোপন, রাজস্ব ফাঁকি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি
দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান North South University–এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য Fouzia Naz–এর বিরুদ্ধে জমি বিক্রির প্রকৃত মূল্য গোপন, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে ইতোমধ্যে তদন্ত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে Anti-Corruption Commission–এর কাছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক সম্পত্তির একটি অংশ নিজের নামে নিবন্ধনের পর প্রায় ১০ কাঠা জমি বিক্রি করেন ফৌজিয়া নাজ। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫০ কোটি টাকা। তবে দলিলে বিক্রয়মূল্য দেখানো হয় মাত্র ২০ কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, বাকি প্রায় ৩০ কোটি টাকা দলিলের বাইরে নগদ ও অনিবন্ধিত লেনদেনের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থনীতি ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্য গোপন রেখে কম মূল্য প্রদর্শন করলে নিবন্ধন ফি, আয়করসহ বিভিন্ন সরকারি কর ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়। এ ধরনের লেনদেন অনেক সময় অবৈধ অর্থ বৈধকরণ বা মানি লন্ডারিংয়ের কৌশল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিক্রয়মূল্যের একটি অংশ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন করা হলেও প্রায় ২০ কোটি টাকা নগদে গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ এলাকায় অবস্থিত Bank of Ceylon–এর একটি ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে, যা তদন্তে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
বিদেশে সম্পদের বিস্তার
অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, ফৌজিয়া নাজের নামে বিদেশে বিশেষ করে Canada–এ একাধিক আবাসিক সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও নথিপত্রে কমপক্ষে তিনটি আবাসিক সম্পত্তি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দেশে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বিদেশে অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, সম্পত্তি বিক্রির অর্থের একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রায় ১০ কোটি টাকা কানাডায় স্থানান্তরের অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা মিললে তা বিদ্যমান আইনে গুরুতর অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
আইনের দৃষ্টিতে সম্ভাব্য শাস্তি
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে তা Money Laundering Prevention Act, 2012–এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ আইনে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ গোপন করা, সম্পদের প্রকৃত উৎস আড়াল করা কিংবা বিদেশে পাচার করা গুরুতর অপরাধ।
আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিং অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন ৪ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ বা সম্পদের দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ অর্থদণ্ড, অথবা ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অর্থদণ্ড আরোপ করা যেতে পারে।
এছাড়া আদালতের আদেশে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ—যেমন ব্যাংক হিসাব, বাড়ি, ফ্ল্যাট, জমি কিংবা অন্যান্য সম্পত্তি—রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে। অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা বা ষড়যন্ত্রে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও একই আইনে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
তদন্তের দাবি
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ দেশের শিক্ষা খাতের সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, বিষয়টি দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয়–ব্যয়ের উৎস, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির দলিল, দেশ-বিদেশে অর্জিত সম্পদের বৈধতা এবং সম্ভাব্য অর্থ পাচারের বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে বিদেশ গমনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব তদন্তের আওতায় আনার দাবিও উঠেছে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *