রাজশাহীতে ফসলি জমিতে অবৈধ পুকুর খনন: সহিংসতার মুখে কৃষি জমি, নীরব প্রশাসন

বিশেষ প্রতিনিধি | রাজশাহী

সংবিধানের মৌলিক নীতিমালা ও উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাজশাহীর দুর্গাপুর ও মোহনপুর উপজেলায় তিন ফসলি জমিতে অবৈধভাবে পুকুর খনন চলছে। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি মোহনপুরে এক তরুণ নিহতের ঘটনার পর দুর্গাপুরে চারটি এক্সকাভেটরে (ভেকু) অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেও প্রশাসনের কার্যকর ও দৃশ্যমান ভূমিকা না থাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

সহিংসতার চিত্র ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রভাবশালী একটি চক্র জমির মালিকদের অমতে কিংবা নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে জোরপূর্বক ফসলি জমি দখল করে পুকুর খনন করছে।

  • ১৭ ডিসেম্বর: মোহনপুর উপজেলায় এক্সকাভেটরের নিচে পিষে এক তরুণকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।
  • সাম্প্রতিক ঘটনা: দুর্গাপুর উপজেলায় উত্তেজিত জনতা অবৈধ খনন কাজে ব্যবহৃত চারটি এক্সকাভেটরে অগ্নিসংযোগ করে।

এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলেও অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনরোষ

দুর্গাপুর ও মোহনপুরের কৃষকদের অভিযোগ, স্থানীয় ভূমি অফিস ও প্রশাসনের অভিযানগুলো কেবল ‘লোকদেখানো’। সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিযান চালিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই পুনরায় পুরোদমে খনন শুরু হয়। কৃষকদের দাবি, প্রশাসনের কঠোর তদারকির অভাব এবং এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই খননকারীরা আইনকে তোয়াক্কা করছে না।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও সংবিধানের লঙ্ঘন

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবৈধ খনন সরাসরি সংবিধানের অবমাননা।

  • সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫: অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ফসলি জমি ধ্বংস করা এই অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
  • অনুচ্ছেদ ১৮: অনুযায়ী পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব।
  • উচ্চ আদালতের রায়: দেশের উচ্চ আদালত একাধিকবার তিন ফসলি জমির শ্রেণি পরিবর্তন ও অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিলেও মাঠ পর্যায়ে তার কোনো কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি

কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, রাজশাহীর এই উর্বর তিন ফসলি জমিগুলো পুকুরে পরিণত হওয়ার ফলে আঞ্চলিক কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এটি দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। প্রভাবশালী গডফাদারদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

দ্রুত পদক্ষেপের দাবি

এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এক্সকাভেটর জব্দ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। মোহনপুরের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার এবং দুর্গাপুরের নাশকতা রোধে পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত এবং স্বচ্ছ ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *