বিশেষ প্রতিনিধি | রাজশাহী
রাজশাহীর সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ী উপজেলায় অনলাইন জুয়া এখন এক ‘নীরব মহামারি’তে রূপ নিয়েছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা সহজ আয়ের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দিনমজুর—সবাই এখন আন্তর্জাতিক জুয়া সিন্ডিকেটের পাতা জালে বন্দী। এই মরণনেশার কারণে যেমন ভাঙছে সাজানো সংসার, তেমনি বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।
যেভাবে কাজ করে এই মরণজাল
অনলাইন জুয়া বা বেটিং সাইটগুলো এখন আর কোনো গোপন আড্ডার বিষয় নয়। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে সরাসরি মানুষের পকেটে পৌঁছে গেছে এই ক্যাসিনো। নিচে একটি ডায়াগ্রামের মাধ্যমে এই জুয়াচক্রের কার্যপদ্ধতি দেখানো হলো:
ধ্বংসের পথে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থী
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গোদাগাড়ীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা পড়ার টেবিল ছেড়ে দিনরাত বুঁদ হয়ে থাকছে জুয়ার সাইটে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কেউ মায়ের গহনা চুরি করছে, কেউ বা বাবার শেষ সম্বল জমিটুকু বন্ধক দিচ্ছে। দেনার দায়ে অনেক কিশোর ও তরুণ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
ভুক্তভোগী এক বাবা আক্ষেপ করে বলেন, “ছেলের ভবিষ্যতের জন্য জমানো টাকা ও জমি বর্গা দিয়ে জমানো অর্থ—সবই এখন মোবাইলের জুয়ায় শেষ।”
মোবাইল ব্যাংকিং: লেনদেনের প্রধান হাতিয়ার
জুয়াড়িরা এখন আর টাকা লেনদেনে কোনো ঝুঁকি নেয় না। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা (MFS) ব্যবহার করে মুহূর্তেই হাজার হাজার টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ‘ডিপোজিট’ করার প্রলোভনে পড়ে সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টে উপার্জিত অর্থ তুলে দিচ্ছে এজেন্টের হাতে।
এজেন্ট সিন্ডিকেট ও চিহ্নিত ‘হটস্পট’
গোদাগাড়ীর পৌর সদরের হাটপাড়া, মহিশালবাড়ি, সুলতানগঞ্জ ও লালবাগ এলাকায় জুয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ রয়েছে, হাটপাড়া এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র শিক্ষিত যুবকদের ‘এজেন্ট’ হিসেবে নিয়োগ দিয়ে এই ব্যবসা চালাচ্ছে। এরা গোপনে আইডিতে পয়েন্ট লোড করে দেয় এবং কমিশন ভোগ করে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় এদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
আইনি কড়াকড়ি ও সিআইডির পদক্ষেপ
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
- চিহ্নিত ১০০০ এজেন্টের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
- জুয়া পরিচালনার দায়ে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
- জড়িত এমএফএস এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রশাসনের প্রতি আহ্বান
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই ডিজিটাল ক্যাসিনোর লাগাম টেনে না ধরলে গোদাগাড়ীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মেধাশূন্য ও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠবে। কেবল আইনি অভিযান নয়, সামাজিক সচেতনতা ও অভিভাবকদের নজরদারি এখন অপরিহার্য।
পরবর্তী অনুসন্ধান: গোদাগাড়ীর জুয়া সিন্ডিকেটের হোতা কারা? নেপথ্যের গডফাদারদের নাম ও মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের গোপন মাস্টারমাইন্ডদের পরিচয় আসছে আগামী পর্বে।