ম্যাডাম খালেদা জিয়া: জাতীয় ঐক্যের এক অভিভাবকের বিদায়

—মোহাম্মদ আনোয়ার

আজ বাংলাদেশের রাজনীতি ও জাতীয় জীবনের জন্য এক অপূরণীয় শূন্যতার দিন। আমাদের মধ্যে নেই সেই মহীয়সী নারী নেতা, যিনি শুধু স্বপ্নই দেখেননি, বরং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমৃত্যু লড়াই করেছেন। জেল-জুলুম ও নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও যিনি কখনও দেশের মাটি ছেড়ে যাননি। তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ সকাল ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

৮০ বছর ৪ মাস ১৫ দিনের এক বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী জীবনের অবসান হলো আজ। কিন্তু তাঁর সাহস, ত্যাগ এবং আপোষহীন নীতি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য অভিভাবক।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল ত্যাগের ও আপোষহীন নেতৃত্বের এক জীবন্ত প্রতীক। একজন নারী হয়েও তিনি রাজনীতির প্রতিটি পিচ্ছিল ও জটিল পথে অটল থেকেছেন। কারাবাস, অসুস্থতা কিংবা রাজনৈতিক প্রচণ্ড চাপ—কোনো কিছুই তাঁকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁর সেই কালজয়ী উক্তি— “আমি এদেশ ছেড়ে কখনো যাব না”—প্রমাণ করে দেশের প্রতি তাঁর গভীর ও অকৃত্রিম ভালোবাসা।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন ছিল অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া। অনেক সময় মনে হয়েছে ক্ষমতার শূন্যতা বা সামাজিক বাধা তাঁকে থামিয়ে দেবে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া কখনও হাল ছাড়েননি। কারাবাসের দিনগুলোতেও তিনি দেশের মানুষের অধিকার আর গণতন্ত্রের কথা ভেবেছেন। এভাবেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে, প্রকৃত নেতৃত্ব মানে কেবল ক্ষমতা নয়; বরং তা হলো দৃঢ় সংকল্প ও ত্যাগের এক সংমিশ্রণ।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন স্ত্রী ও মা। কিন্তু এই পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তাঁর দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। দেশি-বিদেশি নানামুখী চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি নীতির প্রশ্নে পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু দেশে নয়, বহির্বিশ্বেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আজ দল-মত নির্বিশেষে সবাই বুঝতে পারছেন, তিনি কত বিশাল মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের মাঝেও তিনি ছিলেন এক অঘোষিত ঐক্যের প্রতীক।

আগামীকাল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, মানিক মিয়া এভিনিউতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হবে। এই সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জাতি তাঁকে জানাবে সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা।

বিদায়ের এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও তাঁর সংগ্রাম ও সাহস চিরকাল দেশের মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। তাঁর গৌরবময় কর্মধারা আমাদের শেখায়—ধৈর্য, দৃঢ় সংকল্প এবং আত্মত্যাগই হলো মহৎ লক্ষ্য অর্জনের মূলমন্ত্র। খালেদা জিয়া ছিলেন সেই বিরল নেত্রী, যিনি ক্ষমতার ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শকে ধারণ করেছেন।

আমরা প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর সকল ভালো কাজ কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। তাঁর সাহসী উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন; মানবিকতা আর মমত্ববোধে বাংলার মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরকাল ‘ম্যাডাম খালেদা জিয়া’ নামেই গভীর শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকবেন।


লেখক: গবেষক, কলামিস্ট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষক।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *