বিয়ের দুই মাসের মাথায় পাপিয়া আক্তারের মৃত্যু, স্বজনদের নানা প্রশ্ন

মধ্যরাতে অসুস্থতার খবর, ভোরেই মৃত্যুসংবাদ; দাফনের প্রস্তুতি ঘিরে সন্দেহ পরিবারের

নিজস্ব প্রতিবেদক :

বিয়ের মাত্র দুই মাসের মাথায় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পাপিয়া আক্তারের মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে স্বামীর গ্রামের বাড়িতে অবস্থানকালে গভীর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি। পরে স্বজনেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ গোসল করানো এবং দাফনের জন্য কবর খননের প্রস্তুতি দেখতে পান। এ ঘটনায় পাপিয়ার পরিবার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই মাস আগে ঢাকায় আবু সাঈদের সঙ্গে পাপিয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি স্বামীর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।

পাপিয়ার স্বামীর নাম আবু সাঈদ। তাঁর বাবার নাম ওলিউল্যাহ তালুকদার। তাঁদের বাড়ি চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার ছয়ছিলা গ্রামে, ডাকঘর লোধপাড়া।

পাপিয়ার পরিবারের দাবি, ঘটনার দিন গভীর রাতে আনুমানিক রাত ১টার দিকে আবু সাঈদ ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে পাপিয়ার বাবা ও আত্মীয়স্বজনকে ফোন করে জানানো হয়, পাপিয়ার তলপেটে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। খবর পেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এর কিছুক্ষণ পর আনুমানিক রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে আবু সাঈদের বোনের জামাই পাপিয়ার বাবাকে ফোন করে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ জানান।

মৃত্যুর খবর পেয়ে পাপিয়ার বাবা ও আত্মীয়স্বজন দ্রুত চাঁদপুরের উদ্দেশে রওনা হন। পরিবারের দাবি, সকাল ১০টার মধ্যে তাঁরা আবু সাঈদের বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখতে পান, পাপিয়ার মরদেহ গোসল করানো হয়েছে এবং দাফনের জন্য কবর খননের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে ভিন্ন বক্তব্যের অভিযোগ

পাপিয়ার স্বজনদের দাবি, মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কথা বলেন, কেউ সম্ভাব্য গর্ভপাতজনিত জটিলতার কথা উল্লেখ করেন, আবার কেউ তীব্র পেটব্যথার কথা জানান।

মৃত্যুর কারণ নিয়ে এ ধরনের ভিন্ন বক্তব্যই তাঁদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে বলে দাবি করেছেন পাপিয়ার স্বজনেরা।

তবে এসব বক্তব্যের কোনোটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকের মতামত এবং প্রয়োজন হলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিয়ের পর পারিবারিক টানাপোড়েনের অভিযোগ

পাপিয়ার স্বজনদের দাবি, বিয়ের শুরুতে আবু সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিয়েতে আপত্তি ছিল। পরে তাঁরা বিয়ে মেনে নিলেও পারিবারিকভাবে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপোড়েন ছিল বলে তাঁরা দাবি করেন।

এ ছাড়া বিয়ের কিছুদিন পর সন্তান নেওয়া এবং আবু সাঈদের সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতিকে কেন্দ্র করে পারিবারিক পর্যায়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পাপিয়ার পরিবারের আরও দাবি, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় আবু সাঈদ তাঁর স্ত্রী পাপিয়ার নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলেন। এ বিষয়টি নিয়েও পারিবারিক পর্যায়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে তাঁরা জানান।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়েও ভিন্ন বক্তব্য

পাপিয়ার স্বজনদের দাবি, আবু সাঈদ তাঁর স্ত্রীকে ভালোবাসতেন। তবে পরিবারের কয়েকজন সদস্য, বিশেষ করে তাঁর বড় বোন, এ সম্পর্ক ভালোভাবে মেনে নিতে পারেননি বলে তাঁরা স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন।

পারিবারিক এ ধরনের কোনো বিরোধ পাপিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল কি না, জানতে চায় পরিবার

পাপিয়ার পরিবারের প্রধান প্রশ্নগুলো হলো—অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল কি না, কোনো চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করেছিলেন কি না এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত কোনো প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট বা হাসপাতালের নথি রয়েছে কি না।

এ ছাড়া মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন বক্তব্যের কারণও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছে পাপিয়ার পরিবার।

মৃত্যুর আগে পাপিয়ার শারীরিক অবস্থা, কোনো চিকিৎসা চলছিল কি না এবং সম্ভাব্য অসুস্থতার বিষয়ে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি কী বলছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।

তদন্তেই মিলতে পারে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ

পাপিয়ার পরিবার বলছে, তারা আগাম কোনো পক্ষকে দায়ী করতে চায় না। তাঁদের একমাত্র দাবি, পাপিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে বের করা হোক।

মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত, চিকিৎসা-নথি যাচাই, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও হাসপাতালের তথ্য সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পাপিয়ার মৃত্যু স্বাভাবিক অসুস্থতাজনিত কারণে হয়েছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে—এ বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তদন্ত ও চিকিৎসাবিষয়ক প্রমাণের ভিত্তিতেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *