নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘ ১৭ বছর পর অনুষ্ঠিত একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে—এমন মন্তব্য করে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা। নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি বলেন, এই নির্বাচন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
বিদায়ী ভাষণে তিনি ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে দেশ ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে নিমজ্জিত। সেই সংকটময় মুহূর্তে তিনটি প্রধান লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। তার ভাষায়, “আমরা চেষ্টা করেছি রাষ্ট্রকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে এবং জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে।”
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং ৬০০টির মতো নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার অধিকাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার আইনি ভিত্তি দৃঢ় করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় পুলিশ ব্যবস্থা ছিল ভঙ্গুর ও জনআস্থাহীন। ধাপে ধাপে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিপর্যস্ত ছিল এবং অর্থপাচার ছিল লাগামহীন। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আর নতজানু নয়। জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটকে আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
বিদায়ী ভাষণে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “এই পরিবর্তন তাঁদের আত্মত্যাগ ছাড়া সম্ভব হতো না।” তিনি নতুন সরকারসহ সকল রাজনৈতিক শক্তিকে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বান জানান।
শেষে তিনি বলেন, “নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব এখন সবার। এই ধারাকে যেন কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে না দিই।” জাতির কাছে দোয়া চেয়ে এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বিদায় নেন।