কটূক্তি ও হয়রানির অভিযোগে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের ভোটবিমুখতা

রাজশাহীর ৩৯ আসনে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত

বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

কটূক্তি, হয়রানি ও বৈষম্যের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন সংসদীয় আসনের তৃতীয় লিঙ্গের অনেক ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, ভোটকেন্দ্রে নারী না পুরুষ বুথে দাঁড়াবেন—এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা বা আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবারই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। এর সঙ্গে সামাজিক অপমান যুক্ত হওয়ায় অনেকে ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাররা জানান, তাঁদের অনেকেরই বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে। তবে ভোট দিতে গিয়ে বিভ্রান্তি, কটূক্তি ও হয়রানির কারণে অনেকেই কেন্দ্রে প্রবেশ না করেই ফিরে আসেন। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় তাঁদের সংগঠনগুলোর মধ্যে আলোচনা করে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহীতে ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ নামে একটি সংগঠন রয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা শতাধিক। ২০২৩ সালের জুনে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত ওয়ার্ডে এই সংগঠনের নেত্রী সাগরিকা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তবে তিনিও এবার ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।

রাজশাহী মহানগরের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার মিস পূর্ণিমা (৩৭) বলেন, ২০১৮ সালে ভোট দিতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই ফিরে আসেন। এরপর আর কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে যাননি। তাঁর ভাষায়, ভোটকেন্দ্রে কোন লাইনে দাঁড়াতে হবে—এ নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় অপমানজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

নওগাঁ থেকে রাজশাহী শহরে বসবাসকারী মিস বিজলি (২৯) জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভোট দিতে গিয়ে নারীদের লাইনে দাঁড়ালে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশকে জানালেও ভোট দিতে পারেননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভোটার বলেন, এনআইডিতে পুরুষ লিঙ্গ উল্লেখ থাকলেও সামাজিক পরিচয় নারী হওয়ায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। ফলে পুরুষ বা নারী—কোনো বুথেই সহজে ভোট দেওয়া সম্ভব হয় না।

রাজশাহীর নারী আইনজীবী আইরিন সুলতানা বলেন, সংবিধানে তৃতীয় লিঙ্গের নাগরিক অধিকার স্বীকৃত হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তারা এখনও বৈষম্যের শিকার। তাঁর মতে, ভোটকেন্দ্রে পৃথক বুথ বা বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলে এই সমস্যার সমাধান হবে না।

‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’-এর তথ্যমতে, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২১১ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ৩৯টি সংসদীয় আসনে হালনাগাদ তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারের সংখ্যা ১৭২ জন।

আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের জন্য আলাদা বুথের ব্যবস্থা নেই। তাঁরা নারী বা পুরুষ—যেকোনো লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে পারবেন।

দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা মুহিন বলেন, ভোটকেন্দ্রগুলো এখনও তৃতীয় লিঙ্গবান্ধব নয়। আলাদা লাইন বা বুথ না থাকায় এবং কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবে ভোট দিতে গিয়ে তাঁরা অনীহা ও অসহযোগিতার মুখে পড়েন।

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করা সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর নাহিদা পারভিন বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা সাংবিধানিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *