রাজনৈতিক বিশ্লেষক:
সম্প্রতি জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আসন্ন গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রকাশ্য সমর্থন নিয়ে কিছু মহলে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য এমন অবস্থান নিরপেক্ষতার পরিপন্থী হতে পারে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতির আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সমালোচনা কেবল অমূলকই নয় বরং অন্তর্বর্তী সরকারের মূল ম্যান্ডেটকে ভুলভাবে বোঝার শামিল।
১. সংস্কারই যখন সরকারের মূল ম্যান্ডেট
এই সরকার কোনো সাধারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়; এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার যার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র সংস্কার। প্রধান উপদেষ্টা গত ১৮ মাসে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান প্যাকেজটি তারই প্রতিফলন। সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত একটি সরকার যখন সেই সংস্কারের পক্ষেই অবস্থান নেয়, তখন তাকে পক্ষপাত নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবেই দেখা উচিত।
২. নেতৃত্ব ও তথ্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত
গণতন্ত্রের অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপ্রধান সংকটের সময় নীরব থাকবেন। বরং নেতার দায়িত্ব হলো জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া। সরকার যখন স্পষ্টভাবে অবস্থান ব্যাখ্যা করে, তখন ভোটাররা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। গণতান্ত্রিক বৈধতা নিশ্চিত হয় তখনই, যখন ভোটাররা সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীনতা পান এবং বিরোধী পক্ষ প্রচারণার সমান সুযোগ পায়—যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
৩. আন্তর্জাতিক নজির ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বিশ্বের বহু উন্নত গণতন্ত্রে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ইইউ-তে থাকার পক্ষে সরব প্রচারণা চালিয়েছিলেন। একইভাবে স্কটল্যান্ড (২০১৪), ফ্রান্স (১৯৬২) এবং তুরস্কের (২০১৭) গণভোটগুলোতে সরকারপ্রধানরা সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন। এই ঘটনাগুলোকে কখনোই অগণতান্ত্রিক বলা হয়নি, বরং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
৪. কোনো নির্বাচনী স্বার্থ নেই
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ দিক হলো, প্রফেসর ইউনূস বা তাঁর উপদেষ্টাদের কোনো ব্যক্তিগত নির্বাচনী বা দলীয় স্বার্থ নেই। তাঁরা ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চান না। একবার সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার ফলাফল বহন করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার। ফলে এই সমর্থনের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক।
৫. সরকারি প্রচারণার লক্ষ্য জনসচেতনতা
জেলা পর্যায়ে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো সংস্কারের বিষয়বস্তু জনগণের কাছে পরিষ্কার করা। ক্রান্তিকালীন সময়ে বিভ্রান্তি ও গুজব রোধে এ ধরনের সরকারি সম্পৃক্ততা অপরিহার্য। এটি কোনোভাবেই জোরজবরদস্তি নয়, বরং নাগরিকদের বুঝেশুনে মতামত দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
উপসংহার
বাংলাদেশের এই সন্ধিক্ষণে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা হবে দায়িত্বহীনতা। যে সংস্কারের প্রত্যাশায় ছাত্র-জনতা আত্মত্যাগ করেছে, সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান অত্যন্ত যৌক্তিক। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই থাকবে, নেতৃত্ব কেবল সেই সিদ্ধান্তকে অর্থবহ করতে সহায়তা করছে। এটাই গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা।