গোপালগঞ্জ–৩ ‘আওয়ামী দুর্গে’ ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উত্তাপ বাড়ছে ‘আওয়ামী লীগের দুর্গ’ খ্যাত গোপালগঞ্জ–৩ আসনে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলাজুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনা।

এই আসনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় দলটির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে—তা নিয়েই মূলত চলছে হিসাব-নিকাশ। ফলে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে নানা প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নেমেছেন সব প্রার্থী।

টুঙ্গিপাড়া ও কোটালীপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত গোপালগঞ্জ–৩ আসনে রয়েছে দুটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৮৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪০৩ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৫০ হাজার ৩৮০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন একজন। মোট ভোটকেন্দ্র ১০৮টি।

স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই আসন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বারবার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা অধিকাংশ সময় জামানত হারিয়েছেন।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতায়। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় তাদের ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মাঠপর্যায়ের গণসংযোগ ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে মূলত ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আলোচনায় থাকা তিন প্রার্থী হলেন—
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান হাবিব এবং অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক।

ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণার দৌড়ঝাঁপ ততই বাড়ছে। দিনরাত সভা, সমাবেশ, পথসভা ও ঘরে ঘরে গণসংযোগ চালাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোট নিজেদের পক্ষে টানতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন প্রার্থীরা।

ভোটাররা বলছেন, গোপালগঞ্জ–৩ ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হওয়ায় দলটি নির্বাচনে না থাকলেও তাদের ভোটব্যাংক যেদিকে যাবে, সেদিকেই ফলাফলের পাল্লা ভারী হবে। তবে বড় একটি অংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটাররা কেন্দ্রে গেলে, যে প্রার্থী তাদের ভোট পাবেন তিনিই বিজয়ী হবেন।

বিএনপি প্রার্থী এস এম জিলানী বলেন,
“বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাররা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এমনকি বিএনপিও এলাকায় রাজনীতি করতে পারেনি। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর আমরা নির্বিঘ্নে রাজনীতি করতে পারছি। এতে ভোটাররা আশ্বস্ত হচ্ছেন। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করবে।”

স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান বলেন,
“এ আসন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মস্থান। তাই আমি বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রচারণা শুরু করেছি। নির্বাচিত হলে মিথ্যা মামলা বন্ধ, স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও বেকারত্ব নিরসনে কাজ করব। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি জয়ী হব।”

অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন,
“মানুষের জন্য কাজ করতেই আমি প্রার্থী হয়েছি। নির্বাচিত হলে ৫ আগস্ট ও ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার পর দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলাগুলো বন্ধে উদ্যোগ নেব। এলাকার উন্নয়নে কাজ করব। সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ আমার পক্ষে রয়েছে।”

সব মিলিয়ে, গোপালগঞ্জ–৩ আসনে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভোটারদের আচরণ, সংখ্যালঘু ভোটের সমীকরণ এবং দলীয় বনাম স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শক্ত অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *