
ড. সুলতান মাহমুদ রেজা
সহযোগী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, শাহ মখদুম কলেজ, রাজশাহী
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অতিশয় ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সামরিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে তখন দেশ এক গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক বাঁক তৈরি করে। ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় অনস্বীকার্য—এর পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনা, জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্নগুলো নতুন গুরুত্বে সামনে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে তাঁর শিক্ষা দর্শনের বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে। কারণ, একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল রাজনৈতিক কাঠামো দিয়ে নির্মিত হয় না; সেই ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল শিক্ষাকে কেবল সনদ (ডিগ্রি) অর্জনের পথ হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন ও আত্মনির্ভরতার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা। তাঁর শাসনামলে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গণশিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে ছিল একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রচিন্তা—শিক্ষিত ও দক্ষ মানুষই হবে উন্নত ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের প্রধান শক্তি।
৭ নভেম্বর: অস্থিরতার ভেতর নতুন পথের সন্ধান
১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে ছিল গভীর অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করা হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্তরে এর চরম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ৬ নভেম্বরের মধ্যরাত পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের ভোরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। সিপাহী ও জনতার যৌথ অংশগ্রহণে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি পায়।
৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেউ দেখেন জাতীয় ঐক্য ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মোড়বদল হিসেবে, আবার কেউ দেখেন ধারাবাহিক সামরিক-রাজনৈতিক অস্থিরতার অংশ হিসেবে। ইতিহাসের মূল্যায়নে এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এসে যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন সামনে আনেন, সেখানে জাতীয় ঐক্য, উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিষয়টি বিশেষ প্রাধান্য পায়।
রাজনীতি থেকে শিক্ষা: রাষ্ট্রচিন্তার বিস্তৃত পরিসর
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনায় সাধারণত জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এর পাশাপাশি তাঁর শিক্ষা ভাবনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন একটি জাতি জ্ঞান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার দিক থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তাঁর রাষ্ট্রচিন্তায় শিক্ষার সঙ্গে অর্থনীতি, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানের একটি প্রত্যক্ষ যোগসূত্র তৈরি করার চেষ্টা দেখা যায়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু চাকরি পাওয়ার প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা ছিল মানুষকে কর্মক্ষম, দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভর করে তোলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
গণমুখী শিক্ষার ভাবনা
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নানা সংকটে জর্জরিত ছিল—শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোর ঘাটতি, শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য এবং বিপুলসংখ্যক নিরক্ষর মানুষ। সব মিলিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল বড় ধরনের পুনর্গঠন।
এই বাস্তবতায় গণশিক্ষার প্রসারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়ার বিশেষ উদ্যোগ, নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনা এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক গণশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শিক্ষার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়।
এই চিন্তার মূল কথা ছিল—শিক্ষা যেন কেবল শহরের মধ্যবিত্ত বা সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের একচ্ছত্র সম্পদ হয়ে না থাকে; শিক্ষা পৌঁছে যাক গ্রাম, প্রত্যন্ত জনপদ এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে। একটি দরিদ্র ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য এই চিন্তা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী, কারণ উন্নয়নের পূর্বশর্তই হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
প্রাথমিক শিক্ষা: জাতির ভিত নির্মাণ
একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তর দুর্বল হলে ওপরের স্তরের যত উন্নয়নই হোক না কেন, তার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ধারণাকে জাতীয় পরিকল্পনার মূল অংশ হিসেবে সামনে আনার প্রয়াস ছিল লক্ষণীয়। গ্রামের একটি শিশুও যেন শহরের শিশুর মতো সমান শিক্ষার সুযোগ পায়—এই সমতার ধারণাই ছিল তাঁর উদ্যোগের অন্তর্নিহিত দর্শন।
কারিগরি শিক্ষা: সনদের বাইরে ‘দক্ষতার বাংলাদেশ’
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনের সবচেয়ে প্রগতিশীল দিকগুলোর একটি ছিল কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন, কেবল সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক সনদধারী তরুণ তৈরি করে তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষি, শিল্প, নির্মাণ, যন্ত্রপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন উৎপাদন খাতে প্রচুর দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।
এই উপলব্ধি থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইউনেস্কোর (UNESCO) ১৯৮০ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—১৯৭৬-৭৭ ও ১৯৭৭-৭৮ সময়ে নতুন পাঠ্যক্রম প্রবর্তন, নিরক্ষরতা দূরীকরণে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং মৌলিক শিক্ষা সংক্রান্ত একাডেমি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ৪টি পলিটেকনিক ও ৫৭টি ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এই উদ্যোগগুলোর তাৎপর্য শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সংখ্যা বৃদ্ধিতে নয়; এর পেছনে ছিল একটি মৌলিক ধারণা—“দক্ষতা ছাড়া উন্নয়ন কখনো টেকসই হতে পারে না।” আজ যখন দক্ষ মানবসম্পদ, কারিগরি শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা তুঙ্গে, তখন সেই সময়ে নেওয়া এই ভাবনার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়।
শিক্ষক: শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণপ্রদীপ
কোনো শিক্ষানীতি যত আধুনিকই হোক না কেন, দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক ছাড়া তার সফল বাস্তবায়ন অসম্ভব। তাই শিক্ষকের পেশাগত মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির মানোন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়। শিক্ষককে কেবল পাঠ্যবই পড়ানোর বস্তু হিসেবে না দেখে, জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা এই শিক্ষা ভাবনায় স্পষ্ট ছিল।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নবদিগন্ত
জাতীয় উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও জিয়াউর রহমানের সময় গুরুত্বারোপ করা হয়। উচ্চশিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি অর্জনের সনাতন গণ্ডিতে না রেখে গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং মুক্ত জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সত্যিকার অর্থে জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন সেখানে শুধু পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা হয় না; বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়, মৌলিক গবেষণা হয় এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের পরবর্তী শিক্ষা পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশ
শিক্ষা দর্শনের আরেকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিক ছিল শিশুদের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশ। শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণ অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’, এবং শিশুদের বিনোদন ও বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি ছিল উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
এর লক্ষ্য ছিল শিশুদের কেবল পাঠ্যবইয়ের মুখস্থবিদ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে, তাদের মুক্তচিন্তার মানবিক ও সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। শিশুর হাতে বইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানচর্চা ও কল্পনার স্বাধীনতাও সমান প্রয়োজন—এই মানবিক চিন্তাটি তাঁর শিক্ষা দর্শনে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনায় ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়টিও স্থান পেয়েছিল। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ও আধুনিক কাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার বিস্তার এবং একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী নৈতিক শিক্ষা লাভের সুনির্দিষ্ট সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
একটি বহুধর্মীয় ও আবহমান বাংলায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো শিক্ষাব্যবস্থার একটি অন্যতম দায়িত্ব। এই জায়গায় শিক্ষা শুধু সাধারণ জ্ঞান দেয় না, মানুষকে প্রকৃত ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলে।
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার মেলবন্ধন
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনকে তাঁর অর্থনৈতিক চিন্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি কৃষি, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছিলেন, আর এসব ক্ষেত্রের মূল চালিকাশক্তি হলো দক্ষ মানুষ।
একজন শিক্ষিত কৃষক সহজে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন।
একজন প্রশিক্ষিত যুবক শিল্পখাতে দক্ষ কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারেন।
একজন কারিগরি শিক্ষার্থী নিজের কর্মসংস্থান নিজেই সৃষ্টি করতে পারেন (উদ্যোক্তা)।
একজন গবেষক দেশের টেকসই সমস্যার নতুন সমাধান উপহার দিতে পারেন।
সংক্ষেপে, তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল একটি প্রধান ‘উৎপাদনশীল শক্তি’।
৭ নভেম্বরের শিক্ষা: রাষ্ট্রের চেয়েও বড় ‘মানুষ’
৭ নভেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যাই থাক, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নাগরিকদের যোগ্যতার ওপর।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা ভৌত অবকাঠামো—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হয় মানুষকে। জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার মূল্যায়নে এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেখানে তরুণরা কেবল চাকরির প্রত্যাশী হবে না; তারা হবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের প্রধান অংশীদার। গ্রাম ও শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমবে এবং শিক্ষাই হবে জাতীয় উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
ইতিহাসের আলোয় মূল্যায়ন
ইতিহাসের যেকোনো ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর তৎকালীন সময়, সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হয়। জিয়াউর রহমানের সময়কালটি ছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জে পূর্ণ। ফলে তাঁর শিক্ষা সংক্রান্ত সকল পরিকল্পনা যে শতভাগ বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল—এমন দাবি ইতিহাসসম্মত নয়।
তবে তাঁর সময়ে গণশিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গ্রামীণ শিক্ষার প্রসার এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি যে জাতীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়নের ইতিহাসে স্থায়ী আলোচনার দাবি রাখে।
বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রাসঙ্গিকতা
আজকের বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও গবেষণার মান ও বাস্তবমুখী দক্ষতার প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনার কয়েকটি দিক আজ নতুন করে প্রাসঙ্গিক:
১. গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা
২. কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার
৩. মানসম্মত শিক্ষক প্রশিক্ষণ
৪. গবেষণানির্ভর উচ্চশিক্ষা
৫. আত্মনির্ভর মানবসম্পদ তৈরি
একটি জাতি যখন বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, তখন তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত নিজের মানুষের মেধা ও দক্ষতায়।
পরিশেষ
ইতিহাসের কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি জাতির রাজনৈতিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন।
জিয়াউর রহমানের শিক্ষা দর্শনকে যদি সেই সময়ের রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে দেখা হয়, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—তিনি শিক্ষাকে রাষ্ট্রের কেবল ‘অলংকার’ হিসেবে নয়, বরং ‘রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার’ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের আবারও সেই মৌলিক প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—আমরা কেমন শিক্ষা চাই? শুধু পরীক্ষায় ভালো জিপিএ অর্জনকারী শিক্ষার্থী, নাকি এমন একজন নাগরিক যিনি আত্মনির্ভরশীল, দেশপ্রেমিক, যুক্তিবোধসম্পন্ন এবং সমাজের সঠিক নেতৃত্ব দিতে সক্ষম?
প্রযুক্তির বিবর্তনে শিক্ষার মাধ্যম ও পাঠ্যক্রম বদলাবে, কিন্তু শিক্ষাকে মানবসম্পদে রূপান্তর করার যে মৌলিক দর্শন—তার প্রয়োজনীয়তা কোনোকালেই ফুরাবে না। সেই অর্থে, ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের শিক্ষা ভাবনাও বাংলাদেশ পুনর্গঠনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ ফারুক হোসেন। ঠিকানা- প্লট-১০৮১, রোড-৫, সেকশন-৭, পল্লবী, ঢাকা-১২১৬।
Copyright © 2026 সাউথ বাংলা নিউজ. All rights reserved.